সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আত্মনির্ভর ভারত: মাইলস্টোন কৃষিবিল-২০২০

সাধনকুমার পাল              

১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে  উদারীকরণের যে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তার সুফল  নিয়ে এখন আর কোন বিতর্ক নেই ।দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ঐ সিদ্ধান্তটি ছিল  যুগান্তকারী সাহসী সিদ্ধান্ত। স্বাধীনতার সাত দশক পরে কৃষকের স্বার্থে  এ রকমই কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। এই সিদ্ধান্ত গুলি অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল। তবুও রাজনৈতিক বিরোধীতা হচ্ছে।দেশবাসীকে  ভুল বোঝানোর প্রয়াস  হচ্ছে । একবার দেখে নেওয়া যেতে পারে কি আছে কৃষক স্বার্থে নেওয়া ঐতিহাসিক কৃষিবিল গুলিতে।


১) কৃষকের উত্পাদন ব্যবসা ও বাণিজ্য (প্রচার ও সুবিধাদি) বিল, ২০২০


  • প্রথম বিলটি কৃষি বাজার সংক্রান্ত। এই বিলে বলা হয়েছে এমন একটি বাস্তুতন্ত্র তৈরি করা হবে, যেখানে কৃষক এবং ব্যবসায়ীরা রাজ্যের কৃষি পণ্য বাজার কমিটির আওতায় নিবন্ধিত কৃষিমান্ডিগুলির বাইরে খামারজাত পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের স্বাধীনতা পাবেন।
  • রাজ্যের ভিতরে ও বাইরে কৃষি উৎপাদনের বাণিজ্য বাধামুক্ত হবে।
  • বিপণন ও পরিবহন ব্যয় কমবে, যার ফলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের আরও ভাল দাম পাবেন।
  • কৃষকদের ই-কমার্সের জন্য একটি সুবিধাজনক পরিকাঠামোও সরবরাহ করবে এই বিল।

২) কৃষকদের (ক্ষমতায়ন এবং সুুুরক্ষা) মূুুুল্য আশ্বাস এবং খামার পরিষেবার চুক্তির বিল, ২০২০

  • এই বিলটি চুক্তিভিত্তিক চাষ সংক্রান্ত। এতে বলা হয়ছেে, কৃষকরা ভবিষ্যতের কৃষি পণ্য বিক্রির জন্য কৃষিবাণিজ্য সংস্থা, প্রক্রিয়াকারক সংস্থা, হোলসেলার, পাইকারি ব্যবসাদার, রফতানিকারক বা বড়মাপের খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে প্রাক-সম্মত মূল্যে চুক্তি করতে পারবেন।
  • এই চুক্তির মাধ্যমে পাঁচ হেক্টরের কম জমির মালিক প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা লাভবান হবেন (ভারতের মোট কৃষকদের ৮৬ শতাংশই প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র কৃষক)।ফারমার প্রোডিউসার কোম্পানি গুলির মাধ্যমে কৃষকরা সংঘবদ্ধ ভাবে চুক্তি চাষের ব্যবস্থা করতে পারবে।
  • এতে করে অপ্রত্যাশিত বাজারের ঝুঁকি কৃষকদের কাঁধ থেকে তাদের স্পনসর সংস্থাগুলির কাঁধে স্থানান্তরিত হবে।ফসল নষ্ট হয়ে গেলেও বীমার সুবিধা পাবে।কারণ চুক্তি বদ্ধ কোম্পানী গুলি বীমার সুবিধা ছাড়া ব্যবসার ঝুকি নেবে  না।
  • আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে কৃষকদের আরও ভাল তথ্য পেতে সক্ষম করবে।
  • বিপণনের ব্যয় কমিয়ে কৃষকদের আয় বাড়াবে।
  • মধ্যস্থতাকারীদের এড়িয়ে কৃষকরা সরাসরি বিপণনে জড়িত থেকে সম্পূর্ণ দাম নিজেরাই পেতে পারবেন।
  • প্রতিকারের সময়সীমা বেঁধে বিভিন্ন বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকরী প্রক্রিয়া তৈরি করা হবে।
  • ফসলের জমি থেকেই চুক্তিবদ্ধ কোম্পানী ফসল তুলে নেবে । কৃষকের পরিবহন খরচ কমবে।

৩) অত্যাবশ্যক পণ্য (সংশোধনী) বিল, ২০২০

  • এই বিলটি পণ্য সম্পর্কিত। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য়ের তালিকা থেকে খাদ্যশস্য, ডালশস্য, তৈলবীজ, পেঁয়াজ এবং আলু জাতীয় পণ্য সরিয়ে নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে এই বিলে। যুদ্ধের মতো কোনও 'অস্বাভাবিক পরিস্থিতি' বাদে এই জাতীয় পণ্যগুলি মজুতে সীমা আরোপ করা হবে না।অনলাইন ব্যবসা ও  প্রতিযোগিতার বাজারে মুষ্ঠিমেয় কিছু মজুতদার মজুত করে বাজার প্রভাবিত করতে পারবে না। 
  • এই বিধান বেসরকারী বিনিয়োগকারীদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা দূর করবে। ফলে বেসরকারী ক্ষেত্র / বিদেশী বিনিয়োগকারীরা কৃষিক্ষেত্রে আকৃষ্ট হবে।  
  • এতে করে, কোল্ড স্টোরেজের মতো কৃষি পরিকাঠামো এবং খাদ্য সরবরাহের শৃঙ্খলকে আধুনিকীকরণের জন্য বিনিয়োগ আসবে।কৃষককে জলের দরে ফসল বিক্রি করতে হবে না।
  • দামে স্থিতিশীলতা এনে কৃষক এবং গ্রাহক উভয়ই সহায়তা করা হবে।
  • প্রতিযোগিতামূলক বাজারের পরিবেশ তৈরি করে কৃষিপণ্যের অপচয় বন্ধ করা হবে।
কিছু প্রশ্ন যা দিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল মানুষকে বিভ্রান্ত করছে--------------

এমএসপির(নুন্যতম সমর্থন মূল্য) কী হবে?

অপপ্রচার: কৃষকদের বিল আসলে কৃষকদের ন্যূনতম সহায়তার মূল্য না দেওয়ার ষড়যন্ত্র।

প্রকৃত সত্য: কিষাণ বিলের ন্যূনতম সমর্থন মূল্যের সাথে কোনও সম্পর্ক নেই। এমএসপি দেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে।এটা শুধুই অপপ্রচার, এর কোন ভিত্তি নেই।

মান্ডিগুলির কী হবে?

ভ্রান্ত ধারণা: এখন মান্ডিগুলি নষ্ট হয়ে যাবে।

প্রকৃত সত্য:মান্ডি গুলি নষ্ট হওয়ার কোন সম্ভবনা নেই,বরং প্রতিযোগীতার বাজারে মান্ডিগুলিতে কৃষকদের নায়্য দাম পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। বাজার ব্যবস্থা একই থাকবে।


বিল কি কৃষকবিরোধী?

ভ্রান্ত ধারণা: বিল কৃষকদের বিরুদ্ধে।

সত্য: বিলের মধ্যে থেকে কৃষকদের রয়েছে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা। এখন কৃষকরা যে কোনও জায়গায়, যে কোনও অঞ্চলে তাদের ফসল বিক্রি করতে পারবেন। এটি 'ওয়ান নেশন ওয়ান মার্কেট' প্রতিষ্ঠা করবে। বড় বড় খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ সংস্থাগুলির সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে, কৃষকরা আরও বেশি মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হবেন।

বড় সংস্থাগুলি কী শোষণ করবে?

অপপ্রচার: বড় সংস্থাগুলি চুক্তির নামে কৃষকদের শোষণ করবে।

প্রকৃত ঘটনা: চুক্তির মাধ্যমে ফসল ক্রয় হওয়ায় কৃষকদের একটি নির্দিষ্ট দাম দেবে বড় বড় সংস্থাগুলি তবে কৃষকের এতে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। কৃষক সেই চুক্তি ইচ্ছামতো প্রত্যাহার করতে পারবেন। চুক্তি প্রত্যাহার করলে কৃষক মুক্ত হবেন, কিন্তু তার কাছ থেকে প্রত্যাহার বাবদ কোনও শুল্ক বা অর্থ নেওয়া হবে না।

কৃষকরা কি তাদের জমি হারাবেন?

অপপ্রচার: কৃষকদের জমি পুঁজিপতিদের দেওয়া হবে।

প্রকৃত ঘটনা: বিলে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে কৃষকদের জমি বিক্রয়, ইজারা ও বন্ধক পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চুক্তি হবে ফসলের সাথে, জমির সঙ্গে নয়।

কৃষকরা কি ক্ষতির মুখে?

অপপ্রচার: কৃষি বিল থেকে বড় বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলি সুবিধাভোগ করবে, কৃষকরা অসুবিধায় পড়বে।

প্রকৃত ঘটনা: বড় বড় কর্পোরেশনের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি রাজ্যে কৃষকরা আখ, চা এবং কফির মতো ফসল বিক্রি করতে পারবেন। এখন ক্ষুদ্র কৃষকরা আরও বেশি সুবিধা পাবে এবং তারা প্রযুক্তি ও দৃঢ় মুনাফায় আস্থা অর্জন করবে।#####









মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দেশভাগ ও পশ্চিমবঙ্গের জন্ম: ইতিহাসের চেপে রাখা অধ্যায়”

সাধন কুমার পাল:::: পশ্চিমবঙ্গ দিবস নিয়ে একসময় বাংলার  রাজ্য রাজনীতি বেশ সরগরম হয়েছিল। গত 20শে জুন 2023 সালে রাজভবনে পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করেন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস কিন্তু রাজ্য সরকার এর পাল্টা পয়লা বৈশাখকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস বলে   বিধানসভায় ঘোষণা করে ।ফলত পাকে  পড়েছিল   পশ্চিমবঙ্গবাসী। পশ্চিমবঙ্গের জন্মদিন তাহলে  কোনটা এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গেলে আমাদের ইতিহাসের আশ্রয় নিতে হয়। তবে এর সত্য ইতিহাস থেকে সরে গিয়ে তথাকথিত   বুদ্ধিজীবীরা সচেতনভাবে দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গের উদ্ভব সম্পর্কে এড়িয়ে গেছেন এমনকি নীরব থেকেছেন সর্বোপরি পশ্চিমবঙ্গ থেকে কে পশ্চিম শব্দটি তুলে দেয়ারও যুক্তি দেখিয়েছেন তারা পশ্চিমবঙ্গ সরকারও অবশ্য এই মতের পক্ষে বিধানসভায় একটি বিল এনেছে সেই বিল বাম ও কংগ্রেস সমর্থন করেছে।  বিজেপি এতে অংশ নেয়নি।পশ্চিমবঙ্গের মমতা সরকারের    যুক্তি কেন্দ্রে রাজ্যের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় অ্যালফাবেট অনুসারে তাই  ওয়েস্ট বেঙ্গলের ডব্লিউ একদম শেষের দিকে...

প্রতিষ্ঠা দিবস গুলিয়ে দিয়ে এ রাজ্যকে পশ্চিম বাংলাদেশ বানানোর ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবে

ভারতের প্রথম "Gen Z Movement"

          লিখেছেন :: সাধন কুমার পাল Gen Z বা  Generation Z  হল সেই প্রজন্ম যারা মূলত ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছে (কিছু গবেষক ১৯৯৫–২০১০ বা ২০০০–২০১৫ পর্যন্তও ধরে নেন)। অর্থাৎ, এই প্রজন্মের মানুষদের বর্তমান বয়স আনুমানিক ১২ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে। ২. নামকরণের কারণ: • Baby Boomers  (১৯৪৬–১৯৬৪) • Generation X  (১৯৬৫–১৯৮০) • Millennials  বা  Gen Y  (১৯৮১–১৯৯৬) • তার পরবর্তী প্রজন্মকে বলা হয় Gen Z। "Z" অক্ষরটি এসেছে ধারাবাহিকতার কারণে। ৩. প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য: • Gen Z হল প্রথম প্রজন্ম যারা জন্ম থেকেই ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে বেড়ে উঠেছে। • এদের বলা হয় Digital Natives (ডিজিটাল-প্রাকৃতিক)। • Facebook, Instagram, YouTube, TikTok, Snapchat, WhatsApp – এসব প্ল্যাটফর্ম এদের জীবনের অংশ। ৪. শিক্ষাগত ও মানসিক বৈশিষ্ট্য: • তথ্য জানার জন্য বইয়ের বদলে বেশি ব্যবহার করে গুগল ও ইউটিউব। • মনোযোগের সময়কাল তুলনামূলকভাবে ছোট (short attention span), তবে একসাথে অনেক তথ...