সাধন কুমার পাল
পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতি আজ এমন এক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে নির্বাচন কমিশনের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাজ—SIR (Special Intensive Revision)—পরিণত হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ঝড়ের কেন্দ্রে। ভোটার তালিকা সংশোধন কোনো রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়; এটি সংবিধানের অধীনে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন ক্ষমতা। কিন্তু বাংলায় এই প্রক্রিয়াটিই হয়ে উঠেছে শক্তি–প্রদর্শনের মঞ্চ, যার সামনে প্রশ্ন উঠছে—
রাজ্যের সাংবিধানিক কাঠামো কি রাজনৈতিক পেশিশক্তির নিচে চূর্ণ হচ্ছে?
মমতা ব্যানার্জির ভাষার রূপান্তর: বিরোধিতা থেকে হুমকির রাজনীতি
শুরুতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বক্তব্য ছিল সরাসরি—
“আমি বেঁচে থাকতে পশ্চিমবঙ্গে SIR হতে দেব না।”
এরপর সময় পাল্টালো।
প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল।
এবং হঠাৎ করে তাঁর সুরও পাল্টে গেল।
এখন তাঁর বক্তব্য—
• “একজন বৈধ ভোটারের নাম কাটলে রক্ত গঙ্গা বইয়ে দেব।”
• “২০২৯-এ বিজেপি দেশ হারাবে।”
• “বাংলা দখল করতে এলে গুজরাট হারাবে।”
• “খেলা হবে”—এই ভাষাও আবার সামনে এল।
এই পরিবর্তন শুধু ভাষার বদল নয়—
এটি রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—
যে SIR নিয়ে তিনি প্রথম দিন রাস্তায় নেমেছিলেন, আজ কেন আর বিরোধিতা নেই?
SIR কি এখন তাঁর সুবিধাজনক অবস্থায় পৌঁছে গেছে?
যদি তিনি মনে করেন SIR মানুষের ক্ষতি করবে,
তাহলে তিনি বিজেপিকে নয়,
নির্বাচন কমিশনকেই আক্রমণ করতেন।
কিন্তু তিনি এখন করছেন উল্টোটা।
এটি স্পষ্টতই দেখায়—
SIR নিয়ে তাঁর উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে, এখন তিনি রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন খেলা খেলছেন।
অভিষেক ব্যানার্জির মন্তব্য: সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ
রাজ্যের ক্ষমতাসীন দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা অভিষেক ব্যানার্জি সম্প্রতি অত্যন্ত বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন—
“মাটি খুঁড়ে হলেও নির্বাচন কমিশনারকে বের করব।”
এই বক্তব্য শুধু অশালীন নয়,
বরং সরাসরি ভারতের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান—নির্বাচন কমিশনের প্রতি হুমকি।
সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের মতে—
• দেশের নির্বাচন কমিশনকে এভাবে লক্ষ্যবস্তু করা
• কমিশনারকে সরাসরি হুমকি দেওয়া
• প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা
—এসব গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর ওপর রাজনৈতিক হামলা।
অনেকেই বলছেন,
এটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়—
এটি সাংবিধানিক শৃঙ্খলার ওপর সরাসরি আঘাত।
সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে পদদলিত করার প্রবণতা: ডীপ স্টেটের প্রশ্ন উঠে আসছে
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ উঠে আসছে—
বহু পর্যবেক্ষক প্রশ্ন তুলছেন,
→ রাজ্যের সরকার কি সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর দাঁড়ানোর বদলে কোনো “ডীপ স্টেট”–এর খেলায় অংশ নিচ্ছে?
কারণ—
• নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ
• সরকারি কর্মচারীদের হুমকি
• প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ
• গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার
• তালিকা সংশোধনের ক্ষমতা দলীয় ক্যাডারের হাতে দেওয়ার অভিযোগ
• বিচার ব্যবস্থাকে আক্রমণ
• কুরুচিপূর্ণ ভাষায় রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ
—এসব আচরণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নিয়মের পরিপন্থী।
ভারতের মতো বৃহৎ গণতন্ত্রে
এমন আচরণ যদি বারংবার দেখা যায়,
তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ জন্মাবে—
রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর বিদেশি ডীপ স্টেট গ্রুপের অবৈধ প্রভাব বাড়ছে কি?
নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও নির্বাচনী স্বাধীনতা কি ক্রমশই সংকুচিত হচ্ছে ?
এই প্রশ্নগুলো নতুন নয়,
বরং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এই প্রশ্নকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
মাঠের বাস্তবতা: SIR–এর ছদ্মবেশে নিয়ন্ত্রণমূলক রাজনীতি, SIR নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের ভয়ংকর ষড়যন্ত্রকে আড়াল করার জন্যই কি মমতা ও তার দলের কর্মীদের আস্ফালন?
বিভিন্ন মিডিয়া রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে—
● BLO–দের জায়গায় পার্টটাইম কর্মী বা দলীয় লোক
এটি SIR–কে নিরপেক্ষ রাখার সমস্ত নিশ্চয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিভিন্ন জায়গায় বিজেপির বুথ লেভেল এজেন্টের জুতোর মালা পড়ে ঘোরানো হচ্ছে হুমকি দেওয়া হচ্ছে এলাকাছাড়া করা হচ্ছে। এইসব জায়গায় BLO রা তৃণমূলের ব্যবস্থাপনায় নিজেদের দায়িত্ব সামলাচ্ছে। এরকম দৃষ্টান্ত প্রচুর। সক্রিয় তৃণমূল কর্মীরাও বি এল এর কাজ করছেন এই দৃষ্টান্ত রয়েছে। সেজন্য মমতা ব্যানার্জি এই সমস্ত কাজ করেছেন অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিকল্পনার সাথে। বিরোধিতার নামে চেচামেচি করছেন সেটা আসলে নিজেদের এই অন্তরঘাতকে লুকিয়ে রাখার জন্য।
● সংখ্যালঘু–প্রধান এলাকায় অস্বাভাবিক নতুন নাম ওঠার অভিযোগ
অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু এলাকায় সংখ্যালঘু বি এল ও নিযুক্ত করা হয়েছে । ফলে ওখানে কি হচ্ছে ওখানে কি হচ্ছে তা কিন্তু বলা মুশকিল। মিডিয়ায় এমন দৃষ্টান্ত দেখা গেছে যে একে জন ব্যক্তিকে বাবা সাজিয়ে প্রায় দুই ডজনের মতো ভোটার এস আই আরে তাদের নাম তুলেছে। মুসলিমদের বাবা ছেলের নামের যা ধরন তাতে এই কাজটি খুবই সহজ। এটা কি করে রোধ করা যাবে? এই নিয়ে কিন্তু নির্বাচন কমিশনের কোন নির্দেশিকা নেই। মুসলিম এলাকায় এই ধরনের ভুয়ো ভোটারকে চ্যালেঞ্জ করার মতো সংগঠন বিরোধীদের নেই। যার ফলে এখানে তৃণমূল কংগ্রেস যা করবে সেটাই চূড়ান্ত।
● সীমান্তবর্তী এলাকায় ডুপ্লিকেট ভোটার
প্রতিদিন মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশীরা বিভিন্ন বস্তি খালি করে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে চলে যাচ্ছে।কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে যে পরিমাণ অনুপ্রবেশকারী আছে তাতে এই চলে যাওয়া বাংলাদেশী মুসলিমদের সংখ্যা হিমশৈলের চুড়া মাত্র। সেজন্য সীমান্ত এলাকায় ডুপ্লিকেট ভোটার মৃত ভোটারের নাম ভোটার তালিকায় থাকা খুবই স্বাভাবিক।
● বিরোধী ভোটারদের নাম বাদ–পড়ার অভিযোগ
এটিও দীর্ঘদিনের সমস্যা, যা আজ আরও তীব্র।
স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠবে পশ্চিমবঙ্গে SIR কি সত্যিই নিরপেক্ষ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, নাকি রাজনৈতিক কৌশল পরিচালনার সুযোগ? মমতা ব্যানার্জির যা রাজনৈতিক কৌশল তাতে খসড়া তালিকায় প্রচুর হিন্দু ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। যাদের নাম বাদ যাবে তাদের হয়ে মমতা ব্যানার্জি মাঠে নেমে লড়াই করতে শুরু করবেন। যাতে হিন্দু ভোটারদের সমর্থন বিজেপির পাল থেকে কেড়ে নিয়ে মমতার ভোট বাক্সে প্রতিফলিত হয়। যা পরিবেশ পরিস্থিতি এরকম কিছু ঘটার সম্ভাবনাই প্রবল।
নির্বাচন কমিশনের অসহায়তা: রাজ্য কর্মচারীর ওপর নির্ভরশীলতা
নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মীবাহিনী নেই।
তারা কাজ করান—
• সরকারি কর্মচারী
• শিক্ষক
• স্থানীয় প্রশাসনের কর্মী
কিন্তু এই কর্মচারীরা সবাই রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন।
ফলে যদি—
• রাজনৈতিক চাপ
• হুমকি
• ভয়
• বদলির আশঙ্কা থাকে,
তাহলে তাঁদের নিরপেক্ষ থাকা কঠিন।
মমতা ব্যানার্জির জামানায় এই বাস্তবতা নির্বাচনী ব্যাবস্থাও স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছে।
বাংলাদেশী উদ্বাস্তু ও মতুয়া ফ্যাক্টর: বিভ্রান্তি, রাজনৈতিক দোলাচল এবং অনিশ্চয়তা
বাংলাদেশি উদ্বাস্তু ও মতুয়া সমাজে—
• নথিপত্র নেই
• নাগরিকত্ব নিয়ে আতঙ্ক
• SIR–এ বাদ পড়ার সম্ভাবনা
এই তিনটির মিশ্রণে গভীর অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এখানে উভয় পক্ষই ভিন্ন সুরে কথা বলছে।
তৃণমূল বলছে—
“আপনাদের নাগরিকত্ব রক্ষা করব।”
বিজেপি বলছে—
“CAAতে আবেদন না করলে সমস্যা হবে।”
স্বাভাবিকভাবেই এই পরিস্থিতিতে ঘোলা জলে মাছ ধরার সুযোগ তৃণমূল কংগ্রেসের মতন দুর্নীতিগ্রস্ত দল হাতছাড়া করবে না।
সামনে যে সংকট আসছে
ভোটার তালিকার খসড়া প্রকাশ হলে—
• নাম বাদ পড়বে
• ভুল নাম ঠিকানা উঠবে
• নতুন নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠবে
• বিরোধী দলের আন্দোলন বাড়বে
• শাসক দলের প্রতিক্রিয়া আরও আগ্রাসী হবে
বাংলায় ভোটার তালিকা সংশোধন আজ শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়—
এটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য এক পরীক্ষা।
পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যতের প্রশ্ন
আজ বাংলায় যে রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে—
হুমকি, আক্রমণ, অবমাননা—
তা শুধু রাজনীতির ভাষা নয়,
এটি গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়ে বড় উদ্বেগের বার্তা।
• নির্বাচন কমিশনকে হুমকি
• SIR–এর ওপর রাজনৈতিক পেশিশক্তি
• প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা
• ডীপ স্টেটের প্রশ্ন
• ভোটার তালিকাকে রাজনৈতিক অস্ত্রে রূপান্তর
• পশ্চিমবঙ্গের ইসলামীকরণের প্রশ্ন।
• গ্রেটার বাংলাদেশের হয়ে ইসলামিক ষড়যন্ত্রের আঁতুড় হয়ে উঠার প্রশ্ন।
এসব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ।
যে রাজ্যে মানুষ নিরাপদে ভোট দিতে পারে না,
সেখানে SIR-এর মতো সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে বিপদে চালিত করা বিপজ্জনক।
বাংলার মানুষ, বাংলার গণতন্ত্র,
বাংলার ভবিষ্যৎ, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের নিস্ক্রিয়তা,এই চারটি প্রশ্ন আজ রাজ্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।##

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন