সাধন কুমার পাল::::
পশ্চিমবঙ্গ দিবস নিয়ে একসময় বাংলার রাজ্য রাজনীতি বেশ সরগরম হয়েছিল। গত 20শে জুন 2023 সালে রাজভবনে পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করেন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস কিন্তু রাজ্য সরকার এর পাল্টা পয়লা বৈশাখকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস বলে বিধানসভায় ঘোষণা করে ।ফলত পাকে পড়েছিল পশ্চিমবঙ্গবাসী। পশ্চিমবঙ্গের জন্মদিন তাহলে কোনটা এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গেলে আমাদের ইতিহাসের আশ্রয় নিতে হয়। তবে এর সত্য ইতিহাস থেকে সরে গিয়ে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা সচেতনভাবে দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গের উদ্ভব সম্পর্কে এড়িয়ে গেছেন এমনকি নীরব থেকেছেন সর্বোপরি পশ্চিমবঙ্গ থেকে কে পশ্চিম শব্দটি তুলে দেয়ারও যুক্তি দেখিয়েছেন তারা পশ্চিমবঙ্গ সরকারও অবশ্য এই মতের পক্ষে বিধানসভায় একটি বিল এনেছে সেই বিল বাম ও কংগ্রেস সমর্থন করেছে। বিজেপি এতে অংশ নেয়নি।পশ্চিমবঙ্গের মমতা সরকারের যুক্তি কেন্দ্রে রাজ্যের বিষয় নিয়েআলোচনা হয় অ্যালফাবেট অনুসারে তাই ওয়েস্ট বেঙ্গলের ডব্লিউ একদম শেষের দিকে হওয়ায় আলোচনার সুযোগ কম পাওয়া যায় কথাটি আংশিক সত্য। তাহলে সব রাজ্যই তো আগের দিকে থাকবে বলে এ দিয়ে নাম রাখতে শুরু করবে রাজ্য বিজেপি মনে করে এসব ছেদ যুক্তি আসল উদ্দেশ্যটা হলো ওয়েস্ট শব্দটি বাদ দিয়ে দেশভাগের সময় হিন্দুদের উপর ঘটে যাওয়া নিঃশংস অত্যাচারের ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেয়ার এক গভীর চক্রান্ত তারা আরো বলে পশ্চিমবঙ্গ নামটা শুনলেই মনে প্রশ্ন আসবে এটা যদি পশ্চিম হয় তাহলে এর পূর্বটা কোথায় স্বাভাবিকভাবেই এর উত্তর আসবে বাংলাদেশ। তখন আরো প্রশ্ন জাগবে তাহলে বাংলাদেশ কি ভাবে হলো, এর উত্তর আসবে বিভাজনের ইতিহাস যে ইতিহাস রচিত হয়েছে এক তীব্র মরণপন সংগ্রাম ও রক্তস্নানের মধ্য দিয়ে। হ্যাঁ একথা ঠিক যে আমরা কেউ ইতিহাসের সেই কালো দিনের কথা স্মরণ করতে চাই না। কিন্তু এটাও তো ঠিক ইতিহাসকে গোপন করা অন্যায়। চলুন কথায় কথায় আজ সেই অজানা ইতিহাসের সন্ধানে যাই। সাল 1947 বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড আন্দোলন তখন শক্তিশালী রূপ লাভ করেছে ।কারণ বঙ্গভঙ্গের জন্য বাঙালি হিন্দু জনগণ ভারতীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরে নিজেদের জন্য একটি পৃথক বাসভূমির দাবি জানাতে থাকে। দেশভাগের সময় মুসলিম লীগের প্রস্তাব ছিল সমগ্র বঙ্গপ্রদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বঙ্গ যা ছিল ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানদের এক রাজ্য। 1946সালের শেষ দিকে বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড বা পশ্চিমবঙ্গ তৈরির আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল। বিশেষত গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস ও নোয়াখালী দাঙ্গার পরে 1947 সালের এপ্রিল মাসে তাৎপর্যপূর্ণভাবে গতি লাভ করে এই বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড আন্দোলন, সাফল্য আসে 20শে জুন 1947 সালে।যখন হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের বিধায়করা 58/ 21 ভোটের ব্যবধানে বঙ্গ বিভাজনের পক্ষে মত দেন।
(লিংকে ক্লিক করুন :: প্রতিষ্ঠা দিবস গুলিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত)
পটভুমি
46 এর দাঙ্গার পরে কলকাতার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটেছিল।পুলিশ মহাপরিদর্শক যখন কলকাতা সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীতে 50% বৃদ্ধির জন্য প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তখন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোর্দি জোর দিয়েছিলেন যে নতুন নিয়োগ প্রাপ্তরা সবাই পাঞ্জাবি মুসলমান হতে হবে যার সাথে গভর্নর ফেডরিক জন বারুজ সহমত পোষণ করেছিলেন প্রশিক্ষণের গতি বাড়ানোর জন্য প্রাক্তন সৈনিকদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। যেহেতু উপযুক্ত প্রার্থী বাংলায় পাওয়া যায়নি তাই পাঞ্জাব থেকে প্রায় 600 পাঞ্জাবি মুসলমান নিয়োগ করা হয়েছিল। মুসলিম লীগ সরকার যখন নতুন নিয়োগকারীদের বিশেষ কিছু বেশি সুবিধা দিয়েছিল তখন বর্তমান গুর্খা পুলিশ সদস্যরা এর বিরোধিতা করেছিলেন এবংপ্রাক্তন গুর্খা পুলিশ সদস্যদের সাথে পাঞ্জাবি মুসলিম পুলিশেরা সশস্ত্র সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েছিলেন।পাঞ্জাবি মুসলিম পুলিশ বাঙালি হিন্দু পরিবার গুলিতে বিনা কারণে মাঝেমধ্যে ঢুকে পড়তো এবং নারীদের শীলতাহানি করতো ।12ইএপ্রিল পুলিশ মানিকতলায় এক বাঙালি হিন্দু বাড়িতে প্রবেশ করে এবং বাসিন্দাদের মারধর করে। ছায়ালাতা ঘোষ যিনি সেই সময় গর্ভবতী ছিলেন তিনিও গুরুতর আহত হয়েছিলেন, অপরদিকে 14ই এপ্রিল পুলিশ হ্যারিসন রোডে অপর এক বাঙালি হিন্দু গৃহবধুকে ধর্ষণ করেছিল। একই ধরনের ঘটে যাওয়া এই জাতীয় আরেকটি ঘটনা বেশ কিছু সময়ের জন্য সংবাদের শিরোনামে এসেছিল। কলকাতা দাঙ্গা তদন্ত কমিটি পর্যবেক্ষণ করেছে যে পুলিশ তরুণ বাঙালি হিন্দু ছেলেদের গ্রেপ্তার করতো যাতে প্রমাণ দেয়ার জন্য কমিটির সামনে হাজির হতে না পারে। কলকাতার ডেপুটি পুলিশ কমিশনার শামসুদ্দোহা পরিকল্পিতভাবে হিন্দু যুবকদের গ্রেপ্তার করেছিলেন। পুলিশি বাড়াবাড়ির সমালোচনা করার জন্য তৎকালীন সংবাদপত্রের মন্তব্যে মুসলিম লীগ সরকার হিন্দু মালিকানাধীন মিডিয়া যেমন অমৃতবাজার পত্রিকা হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড আনন্দবাজার পত্রিকার সেন্সরশিপ চাপিয়ে দিয়েছিল। একটি বিশেষ অধ্যাদেশের মাধ্যমে মুসলিম লীগ সরকার নিরপেক্ষ পর্যালোচনার উপর জরিমানা আরোপ করেছিল এবং তাদের সিকিউরিটি ডিপোজিট বাজেয়াপ্ত করেছিল।
পূর্ব বাংলার কিছু শহরে আত্মরক্ষার জন্য বাঙালি হিন্দু মেয়েরা স্কুলে যাওয়ার সময় তাদের পোশাকের নিচে 'বাঘ নখ'-এর মতো ধারালো অস্ত্র বহন করতে শুরু করেছিল।
হিন্দুদের চেতনা জাগরন
এই ঘটনার আঁচ বাঙালি হিন্দুরা অনেক আগে থেকেই উপলব্ধি করেছিল তাই 5ই মার্চ 1947 সালে কিরণশংকর রায় তৎকালীন বাংলার গভর্নর ফেডরিক জন বারুজের সঙ্গে দেখা করেছিলেন গভর্নরকে তিনি আসু সমস্যাগুলিকে তুলে ধরেছিলেন। পক্ষান্তরে গভর্নর মিস্টার রায়কে সার্বভৌম ও সংহতিপূর্ণ বাংলার প্রশ্নে বাঙালি হিন্দুদের মতামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন মিস্টার রায় সংক্ষেপে বলেছিলেন যে মুসলিম লীগ সরকারের প্রতি বাঙালি হিন্দু এতটাই বিরক্ত যে তারা এই পদক্ষেপের প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়া গড়ে তুলতে পারে মুসলিম লীগ সরকারকে কর দিতে তারা অস্বীকার করবে এবং তাদের নিজস্ব সমান্তরাল সরকারও প্রতিষ্ঠা করবে। গভর্নর ফেডারিক বারুজ মুসলিম লীগ সরকারকে মিস্টার রায়ের প্রস্তাব ও সংশয় গুলি জানান কিন্তু লীগ এ বিষয়ে তেমন কোন ভূমিকা নিতে আগ্রহী ছিল না।
ফলত বাঙালি হিন্দুদের হোমল্যান্ড আন্দোলন আরো গতি পায় ১৯৪৭ সালের পয়লা মে হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ডের একটি কার্টুনে বঙ্গভঙ্গ সংক্রান্ত বিভিন্ন দাবি দেখায়। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ভারত বিভাগ না হলেও বিশেষত বাংলা ভাগের উপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন।
প্রস্তুতি
ঐতিহাসিক অমলেন্দুদের মতে কলকাতায় দাঙ্গার সময় প্রথমবারের মতন বঙ্গভঙ্গের দাবি তুলেছিল বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভা।তবে ইতিহাসবিদ দীনেশ চন্দ্র সিনহার মতে, বঙ্গভঙ্গের দাবিতে আন্দোলনের উদ্দেশ্যে 'গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং'-এর কয়েক মাস আগেই পশ্চিমবঙ্গ প্রাদেশিক কমিটি গঠিত হয়েছিল।
১৯৪৬ সালের শেষের দিকে বাঙালি হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা বেঙ্গল পার্টিসন লীগ একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। তাদের মধ্যে প্রধান ব্যক্তি ছিলেন হেমন্ত কুমার সরকার , নলিনাক্ষ সান্যাল, মেজর জেনারেল এসি চ্যাটার্জি, যাদব পাজা, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, শিশির কুমার বন্দোপাধ্যায় শুবোধ চন্দ্র মিত্র ও শৈলেন্দ্র কুমার ঘোষ । বেঙ্গল পার্টিশন লীগ পরবর্তীকালে বেঙ্গল প্রাদেশিক সম্মেলন নামে আত্মপ্রকাশ করে । ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভা বাংলার হিন্দুদের জন্য একটি পৃথক প্রদেশ গঠনের জন্য একটি কমিটি গঠন করে এবং তাদের প্রচার শুরু করে জেলাগুলিতে।
রাজনৈতিক
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে তারা তারকেশ্বরে তিন দিনব্যাপী বেঙ্গল হিন্দু সম্মেলন আহ্বান করে। সারা বাংলা থেকে 400র বেশি প্রতিনিধি এবং শেষ দিন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ এখানে জমায়েত হয়েছিলেন।সম্মেলনের প্রথম দিনে তার সভাপতির ভাষণে নির্মল চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী সফল আন্দোলনকে বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ব্রিটিশরা বঙ্গভঙ্গের আশ্রয় নিয়েছিল "দেশের স্বাধীনতার জন্য কর্মরত বৃহত্তম জাতীয়তাবাদী শক্তিকে পঙ্গু করার উদ্দেশ্যে, যার মাধ্যমে তারা বাংলার হিন্দুদের উভয় প্রদেশেই সংখ্যালঘুতে পরিণত করেছিল।" তিনি ব্যাখ্যা করেন, এখন বঙ্গভঙ্গের দাবি জানানোর কারণ হলো বাঙালি হিন্দু জাতীয়তাবাদকে টিকিয়ে রাখা, বাঙালি হিন্দু জনগণের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমি তৈরি করা ও ভারতের মধ্যে একটি প্রদেশ গঠন করা এবং বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করা। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, এটি ছিল বাঙালি হিন্দুদের জন্য বেঁচে থাকার লড়াই বা অস্তিত্বের প্রশ্ন। ৫ ই এপ্রিল তারকেশ্বরে বঙ্গীয় হিন্দু সম্মেলনের বক্তৃতায় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বঙ্গভঙ্গ কে সাম্প্রদায়িক সমস্যার একমাত্র সমাধান হিসেবে প্রস্তাব গ্রহণ করিয়েছিলেন। সম্মেলনের শেষের দিন বঙ্গ হিন্দু সভার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশভাগের প্রস্তাব সনৎ কুমার রায়চৌধুরী ও সূর্য কুমার বোস উত্থাপন করেছিলেন। তারকেশ্বরে বেঙ্গল হিন্দু সম্মেলনে রেজুলেশন পাস হয় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কে বাঙালি হিন্দুদের জন্য পৃথক প্রবেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কর্মপরিষদ গঠনের অনুমতি দিয়েছিলেন ।সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল যে জুন মাসের শেষ নাগাদ এই লক্ষ্যে এক লক্ষ স্বেচ্ছাসেবক তালিকাভুক্ত হবে। গণপরিষদ কে প্রদেশ বিভাগের জন্য একটি সীমানা কমিশন নিয়োগের জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল।
৪ঠা এপ্রিল তারকেশ্বরে যেদিন বেঙ্গল হিন্দু সম্মেলন চলছে ঠিক সেদিনই বেঙ্গল কংগ্রেসের ওয়ার্কিক কমিটি বঙ্গভঙ্গের দাবিতে একটি প্রস্তাব পাস করে। সভায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কৃতিশ চন্দ্র নিয়োগী বিধান চন্দ্র রায় নলিনী রঞ্জন সরকার, প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় , দেবেন্দ্রলাল খান, মাখনাল সেন এবং প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত উপস্থিত ছিলেন। এরপর বঙ্গীয় হিন্দু সভা তাদের প্রচারকে আরো তীব্র করেছিল।। শ্যামাপ্রসাদ বলেছিলেন বঙ্গভঙ্গের আন্দোলন সরাসরি ভারত বিভাগের সাথে সম্পর্কিত ছিল না। এমনকি পাকিস্তান তৈরি না হলেও বাঙালি হিন্দু জনগণের সুরক্ষা এবং তাদের সংস্কৃতির জন্য বঙ্গভঙ্গ করা দরকার ছিল।
২২ এপ্রিল নয়া দিল্লিতে একটি জনসভায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন যে মুসলিম লীগ মন্ত্রিপরিষদ মিশন পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে একটি পৃথক প্রদেশ গঠন করা দরকার। পুরো বাংলাকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করার দাবির বিরোধিতায় তেইশে এপ্রিল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বাংলায় সাধারণ ধর্মকে ডেকেছিলেন। এই ধর্মকট শুরুতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থন করেছিল পরে ট্রাম ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন সিআটিইউ এর অধীনে এই ধর্মঘট কে প্রত্যাখ্যান করার পরিকল্পনা করেছিল। এই খবর যখন তার কাছে পৌঁছালো তখন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম ডিপোতে গিয়েছিলেন। ট্রাম কর্মীদের সফলভাবে ধর্মঘটে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করেছিলেন।
মিডিয়া
বাংলার পত্র পত্রিকা ও তখন এই বাঙালি হিন্দুর হোম ল্যান্ড তৈরির দাবির ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভালো ভূমিকা পালন করেছিল।। কালি কিংকর রায়ের সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রথমবারের মতন সাম্প্রদায়িক সমস্যা সমাধানের জন্য বঙ্গভঙ্গ করা পরামর্শ দেয়। ১৯৪৬ সালের আগস্টে গ্রেট কলকাতা কিলিং এর পরে দ্যা স্টেটসম্যান এবং অমৃতবাজার পত্রিকার চিঠিপত্রের কলাম গুলি এই বিভাগের পক্ষে ও বিপক্ষে লেখকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বরে প্রবাসী নামে একটি বাংলা ভাষার সাপ্তাহিক মন্তব্য করেছিল যে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পুনর্মিলন এবং সহযোগিতার সম্ভাবনা খুবই কম বাংলা ভাগের প্রস্তাব বিবেচনা সময় এসেছে। ১৯৪৭ সালের এপ্রিলে সজনীকান্ত দাস শনিবারে চিঠিতে মতামত দিয়েছিলেন যে এটি বিভাজন করাই সবচাইতে ভালো। অমৃতবাজার এই আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য বেঙ্গল পার্টিশন ফান্ড তৈরি করেছিলেন।
বুদ্ধিজীবি
১৫ মার্চ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কলকাতায় একটি সভার আয়োজন করেন, যেখানে রমেশচন্দ্র মজুমদার, মাখনলাল রায়চৌধুরী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং পণ্ডিত রামশঙ্কর ত্রিপাঠীর মতো বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় শ্যামাপ্রসাদ ব্যাখ্যা করেন যে, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে এটা পরিষ্কার যে পাকিস্তানে হিন্দুরা সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারবে না। তাই, বাঙালি হিন্দুদের জন্য একটি আবাসভূমি তৈরি না করা পর্যন্ত তারা সঠিক পুনর্বাসন পাওয়ার আশা করতে পারে না। নিজের বক্তব্যে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বাঙালি হিন্দুদের জন্য পৃথক আবাসভূমির প্রস্তাবকে সমর্থন জানান। সম্মেলনে ঘোষণা করা হয় যে, প্রদেশের বিভিন্ন অংশ থেকে পাওয়া ১০৬টি প্রস্তাবের মধ্যে মাত্র ছয়টি প্রদেশের বিভাজনের বিপক্ষে ছিল, অন্যদিকে ৯৪.৩৩ শতাংশ মানুষ বাঙালি হিন্দুদের জন্য আবাসভূমি তৈরির পক্ষে মত দিয়েছিল। ৭ মে মেঘনাদ সাহা, যদুনাথ সরকার, রমেশচন্দ্র মজুমদার এবং সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট বাঙালি হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা নিরাপত্তার খাতিরে বাঙালি হিন্দুদের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমির দাবি জানান। মে মাসে হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেস যৌথভাবে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করে, যার সভাপতিত্ব করেন ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার, যেখানে তারা দেশভাগের দাবি জানায়।
বিচার বিভাগ
কলকাতা হাইকোর্টের আইনজ্ঞরা বাঙালি হিন্দুদের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। অন্যথায়, তাঁরা মনে করেছিলেন যে, বাঙালি হিন্দুরা কেবল এক ধরনের দাসত্বের পরিবর্তে অন্য ধরনের দাসত্বের দিকেই ধাবিত হবে। ৫০ জন আইনজ্ঞ বঙ্গভঙ্গের দাবি জানিয়ে একটি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছিলেন।
লবিং (তদবির) ১ এপ্রিল, বাংলা থেকে গণপরিষদের ১১ জন সদস্য বঙ্গভঙ্গের সমর্থনে ভাইসরয়ের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেন। ২৩ এপ্রিল, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেনের সাথে দেখা করে ব্যাখ্যা করেন যে, যদি ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় এবং ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়, তবে বাংলাকেও বিভক্ত করা উচিত। ২৬ এপ্রিল, কিরণ শঙ্কর রায় এবং বিধানচন্দ্র রায় উভয়েই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে আশ্বস্ত করেন যে, তারা কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিকে বঙ্গভঙ্গের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বোঝাবেন। ৩ মে, পূর্ব বাংলা থেকে গণপরিষদের দুজন তফসিলি জাতি প্রতিনিধি একটি পার্টিতে ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেনের সাথে দেখা করেন এবং জানান যে তফসিলি জাতি সম্প্রদায় মুসলমানদের নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন ও আধিপত্যের অধীনে থাকতে বদ্ধপরিকর নয়। তারা দৃঢ়ভাবে বঙ্গভঙ্গের দাবি জানান এবং পরামর্শ দেন যে ৭০ লক্ষ তফসিলি জাতিভুক্ত মানুষকে পশ্চিম বাংলায় প্রস্তাবিত বাঙালি হিন্দু আবাসভূমিতে স্থানান্তর করা উচিত।
বাইরের সমর্থন ৩০ এপ্রিল, কলকাতায় অনুষ্ঠিত চেম্বার অফ কমার্সের বৈঠকে বঙ্গভঙ্গের প্রতি সমর্থন জানানো হয়। জি. ডি. বিড়লার মতে, দেশভাগ কেবল অনিবার্যই ছিল না, বরং সাম্প্রদায়িক সমস্যা সমাধানের একটি চমৎকার উপায়ও ছিল। মুসলিম মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও বাংলা ভাগের পক্ষে ছিল, কারণ তারা টাটা ও বিড়লাদের অসম প্রতিযোগিতা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে চেয়েছিল।
ফলাফল ২৮ জুন ১৯৪৭, বাংলার গভর্নর ফ্রেডরিক বারোজ বাংলার কংগ্রেস অ্যাসেম্বলি পার্টির নেতা প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষকে পোর্টফোলিও বা দাপ্তরিক ক্ষমতা ছাড়াই একটি মন্ত্রিসভা গঠনের আমন্ত্রণ জানান। মন্ত্রিসভার মন্ত্রীদের সমস্ত সরকারি নথিপত্র দেখার এবং সে বিষয়ে মন্তব্য করার অধিকার থাকবে। প্রদেশের অ-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোকে প্রভাবিত করে এমন যেকোনো প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর অধিকারও তাদের থাকবে। বাঙালি হিন্দু নেতৃত্ব এবং সংবাদমাধ্যম এই ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে, কারণ এর অর্থ ছিল মুসলিম লিগ মন্ত্রিসভা তখনও ক্ষমতায় টিকে থাকবে। ২৯ জুন, নয়াদিল্লিতে কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগের হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত নেয় যে, মুসলিম লিগ সরকার বাংলায় ক্ষমতায় থাকবে, তবে তাদের ক্ষমতা সীমিত থাকবে যা কেবল পূর্ব বাংলার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোর জন্য আইন প্রণয়নের অনুমতি দেবে। অন্যদিকে, বাংলার কংগ্রেস অ্যাসেম্বলি পার্টি পশ্চিম বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলো পরিচালনার জন্য একটি শ্যাডো ক্যাবিনেট বা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করবে। তদনুসারে, ২ জুলাই প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ পোর্টফোলিওসহ এগারো সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা ঘোষণা করেন। মন্ত্রিসভায় তফসিলি জাতিভুক্ত সদস্য হেমচন্দ্র নস্কর (কৃষি, বন ও মৎস্য বিভাগ) এবং রাধানাথ দাস (নাগরিক সরবরাহ বিভাগ) অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
সময়রেখা
১৫ মার্চ, কলকাতায় বঙ্গীয় হিন্দু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
২৯ মার্চ, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বাঙালি হিন্দুদের আবাসভূমি গঠনের জন্য একটি প্রস্তাব পাস করে।
১ এপ্রিল, বাংলার গণপরিষদের ১১ জন সদস্য বঙ্গভঙ্গের দাবি জানিয়ে ভাইসরয়ের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেন।
৪ এপ্রিল, তারকেশ্বরে বঙ্গভঙ্গ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
২৩ এপ্রিল, বঙ্গভঙ্গের সমর্থনে কলকাতায় পরিবহন ধর্মঘট পালিত হয়।
৪ মে, প্রদেশটি ভাগের জন্য পুরো বাংলা জুড়ে একই সাথে ২,০০০টি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
৭ মে, দেশভাগের সমর্থনে কলকাতায় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
৩ জুন, মাউন্টব্যাটেন বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।
২০ জুন, বঙ্গীয় আইনসভার হিন্দু বিধায়করা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ভোট দেন।
আপদের মূল্যবান মতামত কমেন্টে লিখুন

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন