🌋 উত্তরবঙ্গ লুটের মহাকাব্য: প্রকৃতির কান্না, আর রেড রোডের কার্নিভালে তুরুক তুরুক নাচ
সাধন কুমার পাল🌧️ বিপর্যয়ের দিনে উৎসবের উল্লাস
২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর, শনিবার রাতে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে কেঁপে উঠেছিল দার্জিলিংয়ের পাহাড় ও সমগ্র উত্তরবঙ্গ। ৫ অক্টোবর রবিবার সকালে ভেসে ওঠে ধ্বংসের বিভীষিকা—প্রায় ২৮ জনের মৃত্যু, অসংখ্য মানুষ নিখোঁজ।
কিন্তু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই দিনই কলকাতার রেড রোডে দুর্গাপূজার কার্নিভালে অংশ নিলেন—একঝাঁক তারকার সঙ্গে নৃত্য ও আনন্দে মেতে উঠলেন। এই দৃশ্য দেখে পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা দেশ হতবাক। যখন উত্তরবঙ্গ দুঃসহ বেদনায় কাঁপছে, তখন রাজ্যের অভিভাবিকা উৎসবের আলোয় উজ্জ্বল!
সোশ্যাল মিডিয়ায় তখন ভাইরাল হচ্ছিল এক পোস্ট—
“উত্তরবঙ্গে মৃত্যু ২৮, মুখ্যমন্ত্রী কলকাতায় নাচে ব্যস্ত! প্রধানমন্ত্রী টুইট করেছেন দুপুরে ১২:৪২-এ, মুখ্যমন্ত্রী করেছেন ১:৫৮-এ। কলকাতায় একফোঁটা বৃষ্টি হলে রাজ্যজুড়ে স্কুল বন্ধ হয়, আর উত্তরবঙ্গের মৃত্যু ও বিপর্যয় মুখ্যমন্ত্রীর কাছে বিন্দুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ নয়!”
বিপর্যয়ের সময় রাজ্য প্রশাসনের অনুপস্থিতি স্পষ্ট। এনডিআরএফ ও ভারতীয় সেনা উদ্ধারকাজে নেমেছে, কিন্তু রাজ্যের কোনো প্রশাসনিক প্রতিনিধি দৃশ্যমান নয়।
🏔️ বিরোধীরা মাঠে, মুখ্যমন্ত্রী দূরে
৫ অক্টোবর সকালেই বিজেপির নেতারা—রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, সাংসদ রাজু বিস্তা, জয়ন্ত রায়, আনন্দময় বর্মণ, দীপক বর্মণসহ অন্যান্যরা বিপর্যয়স্থলে পৌঁছে যান। কিন্তু তাঁদের মানবিক উদ্যোগের জবাব মেলে হামলার মাধ্যমে।
বিপর্যয় রাজনীতিতে ব্যাকফুটে যাওয়ার জন্য বামনডাঙায় মুখ্যমন্ত্রীর রোষ যেন তৃণমূল কর্মীদের মার মুখি আচরণে প্রতিফলিত হয়। শমীক ভট্টাচার্য ও সাংসদ খগেন মর্মূর উপর চড়াও হয় তৃণমূলের বিক্ষোভকারীরা। জুতো, লাঠি, পাথর উড়ে আসে, গাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চলে। রক্তাক্ত হন খগেন মর্মূ।
বিপর্যয়ের সময় দলমত নির্বিশেষে ত্রাণে অংশ নেওয়া সভ্যতার পরিচয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সেই সংস্কৃতি মৃতপ্রায়। সিপিএম আমলের ‘জনরোষ’-এর অজুহাত আজ তৃণমূলের মুখে ফিরে এসেছে। মমতা ব্যানার্জির “বদলা নয়, বদল চাই” স্লোগান এখন শুধু রঙ বদলের ইতিহাস—লাল থেকে নীলসাদা।
ম্যানমেড বিপর্যয়
রাজ্য সরকারের ব্যর্থতা ঢাকতে যেকোনো ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেটাকে মেনমেড বলে দায় চাপিয়ে দেন হয় কেন্দ্রের ঘারে নতুবা পার্শ্ববর্তী রাজ্যের ঘাড়ে। উত্তরবঙ্গের বিপর্যয় কেউ মুখ্যমন্ত্রী ম্যান মেড বলেছেন। আক্ষরিক অর্থেই এটা একটা ম্যান মেড বিপর্যয়। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত। ১৫ দিন আগে থেকে অতিবৃষ্টির পূর্বাভাস আসছিল। রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি লোককেও বিপজ্জনক এলাকা থেকে সরানো হয়নি। তার ফল হচ্ছে এতগুলো মানুষের মৃত্যু। বিপর্যয়ের পরে চারদিকে ত্রানের হাহাকার। অথচ বিরোধী দল বিজেপির নেতা-মন্ত্রীদের রক্তাক্ত করে দেয়া হচ্ছে ত্রাণ বিলি করার অপরাধে।
😷 করোনা ও বিপর্যয়: একই রাজনীতি
করোনার সময়ও একই চিত্র—বিরোধী দলের নেতা-মন্ত্রীদের গৃহবন্দী করে রাখা, ত্রাণ বিলি বন্ধ করা, প্রশাসনিক নিপীড়ন। তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জন বারলার কান্না, বালুরঘাটের এমপি সুকান্ত মজুমদার ও দেবশ্রী চৌধুরীর গৃহবন্দী অবস্থা—সবই সেই ইতিহাসের কালো পৃষ্ঠা।
তৃণমূলের এক নেতা তখন অকপটে বলেছিলেন—
“সিপিএম যেখানে শেষ করেছিল, আমরা সেখান থেকেই শুরু করেছি।”
🌊 উত্তরবঙ্গের প্রকৃতির উপর দখলদারি
উত্তরবঙ্গ আজ প্রকৃতির নয়, রাজনীতির শিকার। নদী, পাহাড়, বন, চর—সব কিছু দখলদারির কবলে। তৃণমূল কংগ্রেসের আশ্রয়ে চলছে অবৈধ নির্মাণ, বালি ও পাথর চোরাচালান, গাছ কাটা, চর দখল। প্রশাসন জানে—কিন্তু নীরব।
🌱 জলঢাকার বুকের বালি চোরাচালান
নাগরাকাটা ও ধূপগুড়ি ব্লকে প্রায় এক লক্ষ ঘন মিটার বালি পাচার হয়েছে। রাতের অন্ধকারে সিন্ডিকেটের ট্রাকের সারি। নদীর বুক ভরাট হয়ে চর গড়ে উঠছে, যেখানে চলছে চাষ, বসতি ও ব্যবসা। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফল—প্রতি বছর বন্যা ও নদীভাঙন।
🌾 মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই
বন্যা, জমি চাপা পড়া, চাষের ক্ষতি, মৎস্যচাষের ধ্বংস—সব মিলিয়ে এক অসহায় জীবনযুদ্ধ। ধূপগুড়ির ১৩ হেক্টর ধানক্ষেত হারিয়ে গেছে বন্যায়। প্রশাসন নিশ্চুপ—কারণ প্রকৃতির ক্ষতির থেকেও বড় তাদের রাজনৈতিক মুনাফা।
🪓 বন উজাড় ও বন্যপ্রাণীর বিপর্যয়
তিস্তার বানে ভেসে আসা কাঠের স্তূপে চোখে পড়ছে সাদা চন্দনও। প্রশ্ন—উত্তরবঙ্গে চন্দন কাঠ এলো কোথা থেকে? জঙ্গল কেটে, পাহাড় ছিঁড়ে, নদী বক্ষ ভরাট করে তৈরি হয়েছে রিসোর্ট, হোমস্টে, বেআইনি হোটেল।
জঙ্গল উজাড় হওয়ায় হাতি, বাইসন, গণ্ডার, বাঘ আজ মানুষ বসতিতে ঢুকে পড়ছে—প্রকৃতির ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে।
⚖️ আদালতের নির্দেশে কান নেই সরকারের
হাইকোর্ট ও গ্রিন বেঞ্চ বারবার সতর্ক করেছে, কিন্তু তৃণমূল সরকারের কানেই যায়নি।
গ্রামের মানুষ যদি দু’টিন বালি তোলেন, পুলিশ তেড়ে আসে; অথচ ট্রাকের পর ট্রাক বালি পাচার চলে প্রশাসনের নাকের ডগায়।
ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রশাসনিক হিংসা
প্রকৃতির ধ্বংসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের উপর তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত রাজ্য সরকারেরপ্রশাসনিক হিংসা। নদীর গতিপথ বদল, বন উজাড়, চাষের জমি দখল—সব কিছুর প্রতিবাদে যারা মুখ খোলে, তাদের উপরে নেমে আসে দমননীতি। সরকারি সাহায্যের প্রতিশ্রুতি শুধু কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বারবার অভিযোগ করলেও মেলে না পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ বা চিকিৎসা সহায়তা। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে উন্নয়নের নামে।
ত্রাণ নিয়ে অমানবিক বাধা দেওয়ার প্রসঙ্গ আসতেই এক তৃণমূল নেতারা অকপটে স্বীকার করছেন সিপিএম যেখানে শেষ করেছিল আমরা ঠিক ওখান থেকেই শুরু করে দিয়েছি। শুধু বিপর্যয়ের সময়ে ত্রাণ বিতরণে বাধা নয় দীপাবলীর পর থেকে বিজেপি সহ রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক যেকোনো সংগঠন এর কাজকর্মের উপ প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। অর্থাৎ ২৬ শে নির্বাচন পর্যন্ত তৃণমূল বিরোধী কোন রাজনৈতিক দলকে ও সামাজিক সংগঠনকে প্রকাশ্যে কোনো কার্যক্রম করতে দেওয়া হবে না।এই জন্য যা যা করার প্রয়োজন তার সবটাই দল ও প্রশাসন মিলে করবে।
🔥 প্রকৃতির প্রতিশোধ শুরু
প্রকৃতি বারবার সতর্ক করেছে—বন্যা, খরা, নদীভাঙন, মাটির উর্বরতা হ্রাস—সবই মানুষের লোভের বিরুদ্ধে প্রকৃতির প্রতিবাদ। নাগরাকাটা থেকে ফালাকাটা, জলঢাকা থেকে হিশামার—সব জায়গাতেই প্রকৃতি আজ ক্রুদ্ধ।
🕊️ শেষ কথা
উত্তরবঙ্গের নদী, বন, পাহাড় শুধু ভূখণ্ড নয়—এটাই মানুষের জীবনরেখা। কিন্তু রাজনীতির লোভে ও শাসকদলের দখলদারিতে সেই জীবনরেখা আজ মৃতপ্রায়।
প্রকৃতির প্রতিটি ঢেউ, প্রতিটি হাওয়া যেন আজ বলে—
“তোমরা প্রকৃতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছো, এখন প্রকৃতি তার হিসাব নিচ্ছে।”
সংক্ষেপে:
তৃণমূল কেবল রেশন বা চাকরি চুরি করেনি—চুরি করেছে উত্তরবঙ্গের প্রাণ, প্রকৃতির হৃদস্পন্দন। আর যারা এই চুরির বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে, তাদের পরিণতি হয়েছে খগেন মর্মূর মতো রক্তাক্ত।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন